‘পুতুল নাচের ইতিকথা’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ বাংলা সাহিত্যের এমন এক মহীরুহ যা পাঠকদের কেবল একটি কাহিনী দেয় না, বরং মানুষের অস্তিত্বের গোড়ায় এক প্রবল ঝাঁকুনি দেয়। পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় যখন এই কালজয়ী উপন্যাসকে সেলুলয়েডে বন্দি করেন, তখন তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানিকের সেই ‘নিরাসক্ত নির্লিপ্ততা’ (Detachment) ধরে রাখা।
শশী চরিত্রটি কেবল একজন ডাক্তার নয়, সে হলো শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দোদুল্যমান মানসিকতার প্রতীক। তার মনস্তত্ত্বকে 'Existential Nihilism' বা অস্তিত্ববাদী শূন্যতাবোধের নিরিখে দেখা যায়। শশীর 'ইগো' চায় কলকাতার নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং উচ্চতর জ্ঞান। কিন্তু তার 'সুপার-ইগো' (সামাজিক ও পারিবারিক নৈতিকতা) তাকে গ্রামের সেবায় আটকে রাখে। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে শশী একধরণের 'Psychological Paralysis'-এ ভোগে। সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, আর এই সিদ্ধান্তহীনতাই তাকে শেষ পর্যন্ত নিয়তির পুতুলে পরিণত করে।
শশী গাছপালা, নদী বা কুমুদকে নিয়ে যতটা কল্পনাপ্রবণ, কুসুমের রক্ত-মাংসের বাস্তব কামনার সামনে সে ততটাই ভীত। সে আসলে বাস্তবতাকে ভয় পায়। তার কাছে কলকাতা এক মরীচিকা, যা তাকে বর্তমানের যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। হারু ঘোষের প্রতি শশীর ঘৃণা আসলে তার নিজেরই একটি ছায়া। সে তার বাবার মতো হতে চায় না, কিন্তু দিনশেষে বাবার সম্পত্তির হিসেব আর সামাজিক প্রতিপত্তি সামলাতে গিয়ে সে অজান্তেই বাবার উত্তরাধিকার বহন করে। এটি ফ্রয়েডীয় 'Oedipus Complex'-এর এক বিবর্তিত রূপ, যেখানে পুত্র পিতাকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত পিতার তৈরি বৃত্তেই আটকা পড়ে।
জয়া আহসান অভিনীত কুসুম চরিত্রটি 'আইড' (Id)-এর এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সে কোনো সামাজিক নিয়ম বা যুক্তির ধার ধারে না; সে কেবল তার সহজাত প্রবৃত্তি (Instinct) দ্বারা চালিত। কুসুমের চরিত্রের মূল চালিকাশক্তি হলো তার অবদমিত যৌনতা ও ভালোবাসা। সে শশীকে বারবার 'ডাক্তারবাবু' বলে সম্বোধন করলেও তার চোখে থাকে একধরণের কর্তৃত্ব। সে শশীকে তার যুক্তির জগত থেকে টেনে নামাতে চায়। কুসুমের মধ্যে একধরণের 'Masochistic' বা আত্মনিপীড়নমূলক প্রবণতা দেখা যায়। সে জানে শশীকে পাওয়া অসম্ভব, তবুও সে সেই অসম্ভবের পেছনে ছুটে নিজের জীবনকে ছারখার করে। শেষে যখন সে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়, তখন সেটি কেবল প্রস্থান নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের লালিত 'ইলিউশন' বা মোহভঙ্গ। সে বুঝতে পারে, শশী আসলে মানসিকভাবে মৃত। গঞ্জের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কুসুম নিজেকে একজন একক সত্তা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চায়। তার জেদ এবং তার একাকীত্ব তাকে অন্যান্য নারী চরিত্র থেকে আলাদা করে।
কুমুদ হলো সেই মানুষ, যে কখনোই বড় হতে চায় না বা কোনো দায়বদ্ধতা নিতে চায় না। মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় একে 'Peter Pan Syndrome' বলা যেতে পারে। কুমুদ শিল্পমনা এবং রোমান্টিক, কিন্তু তার ভেতরে আছে এক গভীর অস্থিরতা। সে কোনো একটি সম্পর্ক বা স্থানে স্থির থাকতে পারে না। শশীর কাছে সে 'মুক্তির প্রতীক', কিন্তু কুমুদের নিজের কাছে এই মুক্তি আসলে একধরণের 'অস্থিরতা' (Restlessness)। শশী কুমুদকে দেখে নিজের না-পাওয়া জীবনকে কল্পনা করে। কুমুদ শশীর সেই 'Shadow Self' যা সমাজ ও সংস্কারের তোয়াক্কা করে না। কুমুদ যখন জয়াকে (শশীর বোন) নিয়ে চলে যায়, তখন শশীর নৈতিক জগত তছনছ হয়ে যায় কারণ সে তার নিজের অবদমিত ইচ্ছাকে কুমুদের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ নিতে দেখে।
হারু ঘোষের মনস্তত্ত্ব কেবল লোভ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়; তার মধ্যে রয়েছে এক প্রবল 'Will to Power' বা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা। হারু ঘোষ জানেন যে টাকা আর জালিয়াতি ছাড়া এই সমাজে টিকে থাকা কঠিন। তার জালিয়াতির নেপথ্যে কাজ করে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা। তিনি শশীকে ডাক্তার বানিয়েছেন যাতে সমাজে তার সম্মান বৃদ্ধি পায়, কিন্তু শশীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তিনি সবসময় সচেষ্ট। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত হারু ঘোষ তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চান। তার মৃত্যু শশীর জীবনে কোনো স্বাধীনতা আনে না, বরং এক বিশাল ঋণের বোঝা এবং দায়িত্বের পাহাড় চাপিয়ে দিয়ে যায়। এটিই নিয়তির সেই নিষ্ঠুর রসিকতা।
সুমন মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় সিনেমাটোগ্রাফি একটি বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। গঞ্জের সেই কাদা-মাটি, ভাঙাচোরা অন্দরমহল এবং অবারিত মাঠ কেবল পটভূমি নয়, তারা চরিত্রের মানসিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। ইনডোর শটগুলোতে পরিচালক ক্লোজ-আপ ব্যবহার করেছেন যা শশী ও কুসুমের মনের রুদ্ধশ্বাস অবস্থাকে বোঝায়।
উপন্যাসটির পটভূমি ঔপনিবেশিক বাংলা। শশী পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। সে মনে করে স্টেথোস্কোপ দিয়ে সে মানুষের রোগ সারাবে। কিন্তু সে দেখে, এই গ্রামের মানুষের মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। যামিনী কবিরাজের আয়ুর্বেদ বনাম শশীর অ্যালোপ্যাথি—এই সংঘাত কেবল চিকিৎসা শাস্ত্রের নয়, বরং পুরনো ও নতুনের দ্বন্দ্ব। শশী যখন দেখে তার সমস্ত বিজ্ঞান কুসুমের হাহাকার বা বাবার মৃত্যু আটকাতে পারছে না, তখন তার ভেতরে এক ধরণের ‘Nihilism’ বা শূন্যতাবোধ কাজ করে।
সিনেমার শেষে আমরা দেখি শশী গ্রামেই থেকে যাচ্ছে। সে পালিয়ে যাওয়ার সমস্ত সুযোগ পেয়েও নিজেকে সঁপে দেয় সেই গঞ্জেই। এখানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই অমোঘ দর্শন ফুটে ওঠে—‘মানুষ পুতুল মাত্র’। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ একটি মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা যেখানে শশী ও কুসুম আমাদের চিরন্তন অতৃপ্তি ও নিয়তির পাঠ দেয়। সিনেমাটি আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে যে, আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? নাকি আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা?
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *