পর্দার দুই পৃথিবী — ভারত যখন সিনেমা বানায়, বাংলাদেশ তখন সিনেমা বানানোর স্বপ্ন দেখে
সিনেমা শুধু বিনোদন না। এটা একটা দেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি আর গল্প বলার সামর্থ্যের এক অদ্ভুত মিশেল। এই জায়গা থেকে যখন বাংলাদেশি আর ভারতীয় সিনেমাকে পাশাপাশি রাখি, পার্থক্যটা শুধু বাজেটের না, নায়ক-নায়িকারও না — পার্থক্যটা চিন্তার, সিস্টেমের, দেখার ধরনের।
RRR, KGF Chapter 2, Pushpa — এই সিনেমাগুলো যখন বিশ্বের বাজারে ঝড় তোলে, তখন প্রশ্নটা মাথায় আসেই — আমরা কেন পারি না? উত্তরটা কঠিন, কিন্তু সত্যি।
১. ইন্ডাস্ট্রি বনাম ব্যক্তি
ভারতের সিনেমা একটা সিস্টেমে চলে। বাংলাদেশের সিনেমা চলে মানুষের উপর ভর করে।
Yash Raj বা Dharma Productions-এর দিকে তাকালে বোঝা যায়, তারা শুধু সিনেমা বানায় না — সিনেমা ডেভেলপ করে। স্ক্রিপ্ট লেখার পর রিসার্চ হয়, অডিয়েন্স অ্যানালাইসিস হয়, মার্কেট স্টাডি হয়। পুরো ব্যাপারটা একটা কর্পোরেট প্রজেক্টের মতো।
আমাদের এখানে অনেক সময় যা হয় — একজন প্রযোজক টাকা জোগাড় করলেন, পরিচালক গল্প পেলেন, শুটিং হলো, রিলিজ হলো। মাঝখানে রিসার্চ নেই, দর্শক বিশ্লেষণ নেই, মার্কেট পরিকল্পনা নেই। সিনেমা হলে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যায়।
২. স্ক্রিনপ্লে — মেরুদণ্ড যেটুকু শক্ত
সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস স্ক্রিনপ্লে। গল্প না, ক্যামেরা না, হিরো না — স্ক্রিনপ্লে।
ভারতে বড় সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখতে ছয় মাস থেকে দুই বছর লাগে। দশ-পনেরো বার রিরাইট হয়। RRR-এর interval block থেকে climax — সবকিছু এমনভাবে সাজানো যে দর্শক একটু ছাড়তে পারে না। KGF Chapter 2-তে হিরো এলিভেশন, ডায়লগ প্লেসমেন্ট — পুরোটা screenplay-driven।
বাংলাদেশে গল্প প্রায়ই ভালো থাকে। কিন্তু সেই গল্পকে দৃশ্যে দৃশ্যে সাজানোর কাজটা অনেক সময় ঠিকমতো হয় না। ফলে দর্শক জড়িয়ে পড়তে পারে না।
৩. হিরো মানে শুধু অভিনেতা না
ভারতে একজন হিরো একটা ব্র্যান্ড। Allu Arjun, Yash, Shah Rukh Khan — এদের entry scene, পোশাক, body language সব পরিকল্পনা করে বানানো। হিরোর প্রথম দৃশ্য শুট করতে কখনো পাঁচ-সাত দিন লাগে। কারণ ওই এক দৃশ্যেই দর্শক ঠিক করে নেয় — এই মানুষটাকে ভালোবাসবে কিনা।
শাকিব খান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্টার — এটা সত্যি। কিন্তু তাকে আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার মতো পরিকল্পিত উপস্থাপনা, স্ক্রিপ্ট নির্বাচন বা মার্কেটিং — সেটা ধারাবাহিকভাবে হয়নি।
৪. মার্কেটিং — যে শক্তিটা চোখে দেখা যায় না
ভারতে একটা সিনেমার মার্কেটিং বাজেট প্রায়ই প্রোডাকশন বাজেটের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। রিলিজের ছয় মাস আগে থেকে শুরু হয় — announcement poster, character poster, teaser, trailer, গান, interview, reality show, social media trend, advance booking hype। এটা শুধু প্রচার না, এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। দর্শকের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া — এই সিনেমাটা দেখতেই হবে।
আমাদের এখানে রিলিজের এক-দুই সপ্তাহ আগে পোস্টার বের হয়, ট্রেলার আসে, কিছু interview হয়। এত অল্প সময়ে উত্তেজনা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।
সত্যি বলতে, আজকের দিনে ভালো সিনেমা হিট নাও হতে পারে — কিন্তু ভালো মার্কেটিং করা সিনেমা ফ্লপ খুব কম হয়।
৫. টেকনিক্যাল দিক — ক্যামেরা না, পুরো বিজ্ঞান
ভারতীয় সিনেমায় cinematographer, colorist, sound designer, VFX team, action director — সবাই আলাদা, সবাই বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশে এই বিভাগগুলো এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
ট্যালেন্টের অভাব নেই। অভাব হলো system, planning, technical education আর departmental professionalism-এ।
৬. বাজার — একটা চক্রে আটকে আছি
ভারতীয় সিনেমা USA, UK, Middle East, Australia, Europe — সব জায়গায় রিলিজ হয়। বাজার বড়, তাই বাজেট বড়, স্কেল বড়, লাভও বড়।
বাংলাদেশের বাজার ছোট — তাই বাজেট ছোট, স্কেল ছোট, লাভ ছোট। আর এই চক্র ভাঙতে না পারলে ইন্ডাস্ট্রি বড় হওয়ার পথ নেই।
৭. দৃষ্টিভঙ্গি — আসল ব্যবধান এখানেই
ভারত সিনেমা বানায় global market মাথায় রেখে। বাংলাদেশ বানায় ঈদের হল চিন্তা করে।
ভাবুন একটু — চিন্তার এই ফারাকটাই দুই দেশের সিনেমার ফারাক তৈরি করেছে।
তবে মনে রাখবেন, এই ছবিটা শুধু হতাশার না।
বাংলাদেশে গল্পের অভাব নেই। ট্যালেন্টের অভাব নেই। ভালো অভিনেতা আছে, ভালো মিউজিশিয়ান আছে। Chorki, Hoichoi, Netflix — এই OTT প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশি কনটেন্টকে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে নিয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করেছে, যেটা আগে ছিল না।
যা দরকার তা হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, screenplay development culture, শক্তিশালী মার্কেটিং, আন্তর্জাতিক distribution আর একটা studio system।
ভারত বড় সিনেমা বানায় বলে বড় না — ভারত বড় চিন্তা করে বলে বড়।
বাংলাদেশ ছোট সিনেমা বানায় বলে ছোট না — বাংলাদেশ এখনো ছোট ভাবে বলেই ছোট।
যেদিন চিন্তা বদলাবে, সেদিন সিনেমাও বদলাবে। যেদিন আমরা একটা সিনেমার কথা না ভেবে পুরো একটা ইন্ডাস্ট্রির কথা ভাবতে শুরু করবো — সেদিন আসলেই খেলাটা বদলে যাবে।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *