ভূত চতুর্দশীতে দেখে ফেলুন এই ৬টি ক্ল্যাসিক ভৌতিক সিনেমা: ভয়, অস্বস্তি আর সিনেমার অসাধারণ জাদু
সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘ভূত যদি না থাকবে তবে কোত্থেকে হয় ভূতের ভয়!’
গুরুবাক্য সত্য বলে মানতেই হয়। আপনি ভূত বা অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাস করুন কিংবা না-ই করুন, অন্ধকার ঘরে হঠাৎ একটা শব্দ শুনলে বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে ওঠে বৈকি! মানুষের এই ভয় পাওয়ার প্রবণতাকে কেন্দ্র করেই যুগে যুগে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ভৌতিক গল্প, উপন্যাস ও সিনেমা।
হ্যালোউইনের এই সপ্তাহে সায়েবদের All Souls’ Day যেমন আছে, তেমনই আমাদের রয়েছে ভূত চতুর্দশী। দুই সংস্কৃতির এই সময়টায় ভূত, আত্মা আর অজানা জগতের গল্প নিয়ে একটু চর্চা মন্দ কী?
তাই ভাবলাম, এই সুযোগে পৃথিবীর অন্যতম সেরা কয়েকটি মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নামিয়ে দেওয়া ক্ল্যাসিক ভৌতিক সিনেমার কথা বলা যাক। এখানে এমন ছয়টি ছবি বেছে নিয়েছি, যেগুলো শুধু ভয় দেখায় না; পরিচালকের মুন্সিয়ানা, অভিনয়, চিত্রনাট্য আর অদ্ভুত এক অস্বস্তিকর আবহ দিয়ে দর্শকের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেয়।
এগুলো আমার পছন্দের ছয়টি ছবি। আপনার তালিকা হয়তো আলাদা হবে। তবু সিনেমাগুলো একবার দেখে নিতে পারেন।
১. Rosemary’s Baby (1968): ভয় দেখানোর জন্য ভূত দেখানোর প্রয়োজন নেই
রোমান পোলানস্কি পরিচালিত Rosemary’s Baby ভৌতিক সিনেমার ইতিহাসে একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। মিয়া ফ্যারো এই ছবিতে তাঁর অন্যতম সেরা অভিনয়টি করেছেন।
মূলত শয়তানের উপাসকদের ঘিরে তৈরি এই গল্পে পরিচালক এক অদ্ভুত কৌশল নিয়েছেন। ছবির শেষ দৃশ্যের আগে পর্যন্ত খুব বেশি কিছু পরিষ্কার করে দেখানো হয় না। গল্পের চলনেও এমন কিছু নেই, যা দেখে সহজেই পরবর্তী ঘটনা অনুমান করে ফেলা যায়।
কিন্তু অস্বস্তিটা তৈরি হয় অন্য জায়গায়। পুরো ছবি জুড়ে এমন একটি আবহ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দর্শক ক্রমশ সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠেন। আশপাশের মানুষ, পরিচিত পরিবেশ, এমনকি নিজের উপলব্ধিকেও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।
মাঝেমধ্যে কেন যে শিউরে উঠছেন, নিজেও বুঝতে পারবেন না!
সত্যি বলতে, রোমান পোলানস্কির মতো একজন দক্ষ পরিচালকের হাতে পড়েছে বলেই বোধহয় ছবিটি এমন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। আমার কাছে এটি এমন একটি হরর ফিল্ম, যেখানে ভয় তৈরি হয় দেখানোর চেয়ে না দেখানোর কৌশলে।
২. মনিহারা (1961): সত্যজিৎ রায়ের নিঃশব্দ আতঙ্ক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিনটি ছোটগল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় তৈরি করেছিলেন তিন কন্যা। সেই ছবির দ্বিতীয় গল্প মনিহারা। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মণিমালিকা—গয়নার প্রতি যার এক অদ্ভুত আসক্তি।
রবীন্দ্রনাথ গল্পের শেষে এসে ভৌতিক সম্ভাবনাকে এক লাইনে শেষ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু রায়মশাই সিনেমায় সেই রহস্যকে এত সহজে মিটিয়ে দেননি। শেষ পর্যন্ত একটি চমক অপেক্ষা করে থাকে। নাকি দুটি!
তবে মনিহারার আসল আকর্ষণ শুধু তার শেষ দৃশ্যে নয়। পুরো ছবিতে সত্যজিৎ রায় যে পরিবেশ তৈরি করেছেন, সেটিই দর্শককে ধীরে ধীরে অস্বস্তির দিকে ঠেলে দেয়। অসাধারণ সুন্দরী, গয়নার প্রতি অবসেসড মণিমালিকার ফ্যাকাশে মুখ, জেদি হাসি আর অদ্ভুত আচরণ—সব মিলিয়ে চরিত্রটি যেন এক রহস্যময় উপস্থিতি।
কণিকা মজুমদারের অভিনয়ও এই আবহ তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
আমার বিবেচনায়, বাংলা তথা ভারতীয় ভাষার ভৌতিক সিনেমার তালিকায় মনিহারা অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। এখানে ভয় চিৎকার করে আসে না; নিঃশব্দে মনের ভেতর ঢুকে পড়ে।
৩. The Exorcist (1973): যে সিনেমার প্রভাব আজও কাটেনি
উইলিয়াম ফ্রিডকিন পরিচালিত The Exorcist নিয়ে নতুন করে বলার কী আছে! ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিটি ভৌতিক সিনেমার ইতিহাসে এমন এক প্রভাব তৈরি করেছে, যার ছাপ পরবর্তী অসংখ্য হরর ছবিতে দেখা যায়।
ছবির গল্প একটি শিশুকন্যাকে ঘিরে। তার অস্বাভাবিক আচরণ এবং ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে ওঠা পরিস্থিতি সামাল দিতে শুরু হয় এক কঠিন লড়াই। এলেন বার্স্টিন শিশুটির মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয় ছবির আবেগঘন দিকটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
শুনেছি, ছবিটির মূল সংস্করণে আরও কিছু ভয়াবহ দৃশ্য ছিল, যা পরবর্তী সময়ে সম্পাদনা বা সেন্সরের কারণে বাদ পড়েছে—যদিও এই দাবির নির্দিষ্ট সংস্করণভিত্তিক তথ্য যাচাই করে নেওয়া দরকার। ছবিকে ঘিরে অভিনেত্রীদের ভয় পাওয়ার নানা গল্পও প্রচলিত রয়েছে। এসব গল্প ছবিটির চারপাশে এক ধরনের কিংবদন্তি তৈরি করেছে।
আমি ছবিটি প্রথম দেখেছিলাম আজ থেকে অন্তত তিরিশ বছর আগে। এত বছর পরও এর দৃশ্যগুলো মনে আছে। যারা নিয়মিত ভৌতিক সিনেমা দেখেন, তাঁরা The Exorcist দেখলেই বুঝতে পারবেন, পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য চলচ্চিত্র কীভাবে এই ছবির ভাষা, দৃশ্য নির্মাণ ও আতঙ্ক তৈরির কৌশল থেকে প্রভাব নিয়েছে।
এটি শুধু একটি ভয়ংকর সিনেমা নয়; হরর ঘরানার ইতিহাস বুঝতে চাইলেও ছবিটি দেখা দরকার।
৪. Wolf (1994): ওয়ারউলফের গল্পে জ্যাক নিকলসনের জাদু
ওয়ারউলফ বা নেকড়ে-মানুষ নিয়ে হলিউডে কম সিনেমা তৈরি হয়নি। কিন্তু মাইক নিকোলস পরিচালিত ১৯৯৪ সালের Wolf ছবিটি আমার কাছে আলাদা।

ছবির অন্যতম বড় শক্তি এর চিত্রনাট্য এবং দুই প্রধান অভিনয়শিল্পী—জ্যাক নিকলসন ও মিশেল ফাইফার। তাঁদের অভিনয় ছবিটিকে সাধারণ ওয়ারউলফের গল্পের বাইরে নিয়ে গেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন ভারতীয় অভিনেতা ওম পুরী।
এখানে শুধু ভয়ংকর প্রাণীতে রূপান্তরের গল্প নেই; আছে মানুষের ভেতরের পরিবর্তন, প্রবৃত্তি এবং সম্পর্কের জটিলতা। নিকলসনের অভিনয়ের নিজস্ব ধরন ছবির চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
অনেক ওয়ারউলফ সিনেমার ভিড়ে Wolf কেন আলাদা করে মনে থাকে, তা বুঝতে ছবিটি একবার দেখে নেওয়াই ভালো।
৫. Eraserhead (1977): দুর্বল হৃদয়ের দর্শকদের জন্য নয়
ডেভিড লিঞ্চ পরিচালিত Eraserhead (১৯৭৭) এমন একটি সিনেমা, যাকে প্রচলিত অর্থে ভৌতিক ছবি বললে হয়তো পুরোপুরি বোঝানো যাবে না। এর ভয় তৈরি হয় অদ্ভুত দৃশ্য, অস্বাভাবিক শব্দ, অস্বস্তিকর পরিবেশ এবং এক ধরনের দুঃস্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা থেকে।
ছবির অনেক মুহূর্ত দর্শককে অপ্রস্তুত করে দিতে পারে। কিছু দৃশ্য এমনভাবে তৈরি, যা সহজে মাথা থেকে সরানো যায় না। এখানে পরিচিত গল্প বলার ধরন নেই, নেই প্রচলিত হরর সিনেমার নিয়ম মেনে এগোনোর চেষ্টা।
তাই দুর্বল হৃদয়ের দর্শক হলে ছবিটি না দেখাই ভালো!
ডেভিড লিঞ্চের সিনেমা বুঝতে গেলে অনেক সময় যুক্তির চেয়ে অনুভূতির ওপর নির্ভর করতে হয়। Eraserhead তারই এক অদ্ভুত উদাহরণ। ভয় পাওয়ার পাশাপাশি অস্বস্তি, বিভ্রান্তি এবং এক ধরনের মানসিক চাপ অনুভব করতে পারেন।
৬. ক্ষুধিত পাষাণ (1960): রবীন্দ্রনাথের গল্পে তপন সিংহের রহস্যময় নির্মাণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে তপন সিংহ পরিচালিত ক্ষুধিত পাষাণ বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য সৃষ্টি।এখানেও রবীন্দ্রনাথ গল্পের শেষে অলৌকিক সম্ভাবনাকে এক অন্যরকম ভঙ্গিতে শেষ করে দিয়েছেন। কিন্তু তপন সিংহ সিনেমায় সেই রহস্যকে সেভাবে মিটিয়ে দেননি। বরং আলো, আবহসংগীত, লোকেশন ও সেটের ব্যবহারে তৈরি করেছেন এক শিরশিরে পরিবেশ।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের পাশাপাশি রাধামোহন ভট্টাচার্যের পরিশীলিত উপস্থিতি এবং অরুন্ধতী দেবীর অভিজাত সৌন্দর্য ছবির মেজাজের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে গেছে।
ক্ষুধিত পাষাণ দেখার সময় মনে হয়, ছবির পুরোনো প্রাসাদটি যেন নিজেই একটি চরিত্র। তার দেয়াল, করিডর, অন্ধকার ঘর—সবকিছুর মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে অতীতের কোনও অজানা গল্প।
এখানে ভয় তৈরি করতে পরিচালকের খুব বেশি আয়োজনের প্রয়োজন হয়নি। পরিবেশটাই যথেষ্ট। আর সেখানেই তপন সিংহের নির্মাণের সার্থকতা।
ভালো ভৌতিক সিনেমা মানেই শুধু ভূত নয়
এই ছয়টি ছবির মধ্যে গল্প বলার ধরন, নির্মাণশৈলী, সময় ও সংস্কৃতির পার্থক্য অনেক। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মিল রয়েছে—কোনও ছবিই শুধু ভূত দেখিয়ে দর্শককে ভয় পাওয়ানোর ওপর নির্ভর করেনি।
কখনও অন্ধকার ঘর, কখনও মানুষের মনের সন্দেহ, কখনও অস্বাভাবিক শব্দ, আবার কখনও বহু পুরোনো কোনও প্রাসাদের নিঃশব্দ উপস্থিতি—এসব দিয়েই তৈরি হয়েছে সিনেমার ভয়।
আমার কাছে ভালো হরর সিনেমার সার্থকতা এখানেই। সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যখন তার কোনও দৃশ্য মনে পড়ে, অকারণে গা ছমছম করে, কিংবা রাতের অন্ধকারে পরিচিত ঘরটাকেও একটু অন্যরকম মনে হয়—তখনই বুঝতে হবে পরিচালক তাঁর কাজটা ঠিকঠাক করেছেন।
এই ভূত চতুর্দশীতে তাই পরিচিত ভৌতিক গল্পের বাইরে গিয়ে এই ছয়টি ক্ল্যাসিক সিনেমার কোনও একটি বেছে নিতে পারেন। আলো নিভিয়ে, শব্দ একটু বাড়িয়ে বসুন। তবে পরে ঘুমাতে অসুবিধা হলে কিন্তু আমাকে দোষ দেবেন না!
This book offers to-do lists for almost everything you need to transform your life. It empowers you to rightfully take back the power to heal your body, naturally. Using simple yet efficient resources and tools such as replacing medicine with food, mastering the art of listening to your gut feelings, breaking up with sugar and gluten, choosing meals of your own liking and so on, you can become the master (read CEO) of your health.
Buy Nowবিজ্ঞাপন সংযুক্তি: এই লিংক থেকে ক্রয় করলে FameFeed একটি কমিশন পেতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন
আর্টিকেলে মোট কয়টি ক্ল্যাসিক ভৌতিক সিনেমার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর
মোট ছয়টি ক্ল্যাসিক ভৌতিক সিনেমার কথা বলা হয়েছে—Rosemary’s Baby, মনিহারা, The Exorcist, Wolf, Eraserhead এবং ক্ষুধিত পাষাণ।
প্রশ্ন
সত্যজিৎ রায়ের কোন ছবিটি এই তালিকায় স্থান পেয়েছে এবং এটি কোন গল্প অবলম্বনে তৈরি?
উত্তর
সত্যজিৎ রায়ের মনিহারা ছবিটি তালিকায় স্থান পেয়েছে, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে তিন কন্যা সিনেমার দ্বিতীয় অংশ হিসেবে নির্মিত।
প্রশ্ন
ক্ষুধিত পাষাণ সিনেমাটি কে পরিচালনা করেছেন এবং এতে কারা অভিনয় করেছেন?
উত্তর
ক্ষুধিত পাষাণ পরিচালনা করেছ
সম্পর্কিত খবর

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!