রইদ নিয়ে এতো চাপের কিছু নাই পি.এইচ.ডি করা লাগবে না একদম সহজ পরলেই বুঝবেন

আজ সন্ধ্যায় রইদ দেখে ফিরলাম। হল থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। সাধারণত আমার এমন হয় না, কিন্তু এবার কেমন যেন থমকে গেলাম। মাথার ভেতরটা এখনো ঘুরছে।

গল্পটা শুরুতে খুব সাদামাটা লাগে। এক সাধু, তার পাগলী বউ, একটা ছাগল, পেছনে তালগাছ। এই তো। কিন্তু যত এগোতে থাকি, বুঝি এটা আসলে আদম-হাওয়ার গল্প। প্রেম আর পাপ এখানে আলাদা করার উপায় নেই। দুটো একসাথে জড়াজড়ি করে আছে। সিনেমাটা পুরোটা এই টানাপোড়েন নিয়েই চলে।

তাল শুধু ফল না এখানে। সাধু যখন তালের পিঠা খায়, তখন সে প্রেম গিলে ফেলে। একবার গিললে আর বের করা যায় না। সেই বিষ ধীরে ধীরে শরীরে ছড়ায়, হাড় ক্ষয় করে, তবু যায় না। এই অংশটা আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে।

সাধু প্রথমে বউকে দূরে সরিয়ে দেয়। ভাবে জঞ্জাল সাফ হয়ে গেল। কিন্তু দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে আনার পর তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যায়। আর তৃতীয়বার যখন পাগলী নিজে চলে যায়, সাধু চিৎকার করতে চায় কিন্তু পারে না। নামটাই তো জানে না। সেই জায়গায় আমার গলা আটকে গিয়েছিল। মানুষ যাকে ভালোবাসে তার নাম না জানলেও চলে, কিন্তু হারিয়ে গেলে সব ফাঁকা লাগে। এটা খুব সত্যি মনে হয়েছে। সুমন সোজা গল্প বলতে চাননি। তিনি একটা অনুভূতির জগত বানিয়েছেন। সমাজ এসে শেকল পরায়, কিন্তু যে প্রেম খেয়েছে সে শেকল আর ধরে রাখতে পারে না। তুষি যখন দ্বিতীয়বার ফেরে পেটে বাচ্চা নিয়ে, সাধু জিজ্ঞাসা করে বাচ্চাটা কার। কেউ জানে না। সেখান থেকে তুষির চরিত্রটা পুরোপুরি বদলে যায়। মেরির মতো হয়ে ওঠে। এই অংশটা আমার খুব ভালো লেগেছে। কুলসুম মরে যাওয়ার পর সাধু ছাগলের মাংস পুরোটা খেয়ে ফেলে। শুধু খাওয়া না, বউয়ের শেষ টুকরোটাও নিজের ভেতর ঢুকিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। আর শেষ দৃশ্যে তালের স্তূপের মাঝে শুয়ে থাকা সাধু, পাগলী তাকে তাল এগিয়ে দিচ্ছে — তখন মনে হয় প্রেমের কোনো মুক্তি নেই। গন্ধম খেলে আর ফেরার রাস্তা থাকে না। এই শেষটা আমাকে বেশ নাড়িয়ে দিয়েছে। যারা কিছু বোঝেনি তাদের বলি, এটা আদম-হাওয়ার পাপের গল্প। তাল সেই নিষিদ্ধ ফল। সমাজ স্বর্গ থেকে বের করে দেয়। প্রেম সেই বিষ যা মারেও, আবার বাঁচিয়েও রাখে। নূহের নৌকা, মেরির গর্ভ — এসব রূপক এত স্বাভাবিকভাবে মিশে আছে যে জোর করে খুঁজতে হয় না। অনুভব করলেই ধরা পড়ে। ভিজ্যুয়ালগুলো আলাদা। জোহায়েরের ক্যামেরা যেন ছবি এঁকেছে। লম্বা শট, প্রাকৃতিক আলো, ছনের ঘর, তালগাছ, কাশবন — সব এত জ্যান্ত যে বাস্তবকেও ছাড়িয়ে যায়। ‘মন ছাড়া কি’ গানের মেলার দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসছে। নীরবতাই এখানে সবচেয়ে জোরালো। তুষি আর নূর ইমরান দুজনেই নিজের সেরাটা দিয়েছে। তুষির চোখ আর শরীরের ভাষা অসাধারণ। নূর ইমরানের শেষের ভাঙা মানুষটাও মনে গেঁথে থাকে। তবে সত্যি বলি, এই সিনেমা সবার জন্য না। যারা দ্রুত গল্প, টুইস্ট আর পাঞ্চলাইন খোঁজে, তারা হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠবে। গল্প সরল, কিন্তু ভেতরটা জটিল। ধীরে চলে, কম কথা, অনেক কিছু খোলা। কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে দেখবে, তারা একটা গভীর অনুভূতি নিয়ে ফিরবে। প্রেমের শূন্যতা, আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণতা — সব ছুঁয়ে যাবে। সুমন ভাই আবার দেখিয়ে দিলেন, তিনি শুধু সিনেমা বানান না, একটা পুরো দুনিয়া তৈরি করেন। বাংলাদেশের সিনেমায় এমন অভিজ্ঞতা সত্যি বিরল। রইদ দেখলে মনে হয়, কিছু সিনেমা শুধু দেখা হয় না, অনুভব করা হয়। আর এটা ঠিক সেইরকম।